জুলাই আন্দোলনের দেনা পাওয়ার মূল্যায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, জুলাইয়ে কি পেলাম একথা পর্যালোচনা করতে বললে আমি বলবো, জুলাইয়ে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। এর মধ্যে একটা বড় ব্যাপার হলো আমাদের ঘাড়ে একটা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ছিল। হাসিনা ‘ওয়ার অন টেররের’ নামে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন করছিল। এরপর আবার ভারতীয় এজেন্ট হয়ে বাংলাদেশে তার ভূমিকা পালন করছিল। ভারতীয় এজেন্ডাগুলো বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করতো। সেটেলার স্টেট হিসেবে কাজ করতো। সে বলতো আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারতকে অন্য কেউ দিতে পারবে না। তার মন্ত্রী বলেছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। অথচ আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র্। আমাদের থাকার কথা ছিল প্রতিবেশির মতো। আমরা স্বাধীন, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত মর্যাদাপূর্ণ দেশ। কিন্তু শেখ হাসিনা জনগণের চাওয়া পাওয়াকে কেয়ার করতো না। হাসিনা বার বার বাংলাদেশের জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। গুম-খুন করেছে। মানুষের সব মৌলিক অধিকার খর্ব করেছে। জুলাইয়ের আন্দোলন ফ্যাসিবাদী হাসিনার শাসন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করেছে। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনাকে বিতাড়ন করা গেছে। এটা জুলাই আন্দোলনের অনেক বড় পাওয়া বলা যায়।
জুলাইয়ে আমাদের কি পাওয়ার কথা ছিল একথা বলতে গেলে, আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিল। যেমন জুলাইয়ে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। যেন সবাই তার মৌলিক অধিকার ফিরে পায়। সবার নাগরিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। যে কেউ ইচ্ছা করলেই হামলা মামলা করতে পারবে না। আমরা চেয়েছিলাম ইনসাফ পূর্ণ বাংলাদেশ। এদেশের তরুণরা পথ দেখিয়েছিল, তারা রাস্তায় নেমে এসেছিল। জীবন বিলিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। তারা মনে করেছিল যে হাসিনার পরিবর্তন হলেই বড় পরিবর্তন হয়ে যাবে। যদিও কিছু কিছু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমাদের যে চাওয়াটা ছিল, দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়া। মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা পাওয়া। বেকারত্ব দূর হওয়া। সামাজিক অনাচারগুলো দূর হওয়া দরকার ছিল খুব ভালোভাবে। আমাদের তরুণদের হাতকে শক্তিশালী করার কথা ছিল। তাদেরকে তাদের জায়গাতে পৌঁছে দেওয়া। আমরা যদি দেখি যে, পুলিশবাহিনী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হেনস্থা করছে, এরপর আমলাতন্ত্র তাদের জায়গা থেকে কাজ করছে। তারাও জনগণকে জনগণ মনে করে না। আর এমপি মন্ত্রীরাতো কিছুই মনে করে না। এধরণের বিষয়গুলো বাংলাদেশে পরিবর্তন হওয়া দরকার ছিল। মানুষের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল। এতো রক্তের বিনিময়ে আমরা এটাই চেয়েছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম আমাদের ভোটের অধিকার সমুন্নত থাকুক। এখন যা দেখতে পেলাম, এখনো সরকার আমাদের অনেকগুলো অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুীল দেখাচ্ছে। বিশেষ করে যদি বিএনপির কথা বলি, তারা আমাদের গণভোটের যে অধিকার ছিল, সাধারণ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বলেছে যে ৭০ শতাংশ মানুষ পরিবর্তন চায়। মৌলিক সংস্কারগুলো আশ্বাস দিয়েছিল যে তারা তা বাস্তবায়ন করবে। সব রাজনৈতিকদল মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো কিন্তু দেয়নি। সেই জায়গা থেকে বলতে পারি যে, আসলে সেই ব্যবস্থা এখনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো কেউ কেউ সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের কারণে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। এর বাইরে যদি প্রশাসনের দিকে তাকাই দেখবো যে, দলকানা লোককে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসানো হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার যে পরিবর্তনগুলো দরকার ছিল সেটাও হয়নি। এভাবে হিসেব করলে দেখবো জুলাইয়ের না পাওয়াগুলো অনেক। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যেহেতু একবার রাজপথে নেমেছে; তারা তাদের অধিকার আদায় করেই ফিরবে।
প্রশ্ন : আমরা ২০২৪ শে উত্তাল জুলাই দেখলাম, ২০২৫ এ এসে এরকম দেখেছি। ২০২৬ সালে এসে আরেক রকম দেখছি। ২০২৭ সালে গিয়ে কি রকম জুলাই দেখাতে চান ? এমন প্রশ্নের জবাবে সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, আমরা যদি বিশেষভাবে বলি ২০২৪ সালের জুলাইটা আমাদের একটা আল্টিমেট একটা জায়গা। জুলাইয়ের পরে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা মুক্ত স্বাধীনভাবে চলছিলাম। তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। তরুণরা শুধু মাত্র হাসিনাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি। বরং তারা দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেছিল। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় তরুনরা রাস্তায় ট্রাফিকের কাজ করছিল। তরুণেরা স্বেচ্ছায় একাজগুলো করছিল। এটা একটা বড় পরিবর্তন ছিল। ২০২৫ সালে এসে দেখেছি বিভিন্ন জায়গা থেকে জুলাইকে খাটো করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা; তারা বিভিনভাবে জুলাইকে খাটো করার চেষ্টা করেছে। এখানে আমাদের একটা আশার দিকও আছে। আমরা যদি বিশেষ করে বিএনপির কথা বলি, বিএনপির একটা গ্রুপ জুলাইকে খাটো করার চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে বিএনপির এমপি ফজলুর রহমান এবং নিলুফার চৌধুরী মনি জুলাইকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। কালচারাল ফাসিস্টদের পক্ষ থেকেও তাই করা হয়েছে। এর বিপরীতে যদি আমরা দেখি যারা তরুণ বিএনপির নেতৃত্ব আছে, তারা এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শক্তিশালীভাবে ধারণ করি। এজন্য জুলাইকে নিয়ে আমরা একের পর এক অনুষ্ঠান করছি। দেশের প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসে, প্রত্যেকটা মহানগরে, প্রত্যেকটা বিভাগে জুলাই নিয়ে আমাদের অসংখ্য উপন্যাস বের হচ্ছে। আমাদের গল্প গান বের হচ্ছে। শিশুদের জুলাই জানানোর জন্য আমাদের অনেকগুলো জিনিস বর্তমানে মাঠে আছে। এবিষয়গুলো আমরা অব্যাহত রেখেছি। এর একটা প্রভাব আছে। আমাদের দেখাদেখি অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোও জুলাইকে ধারণ করছে। অন্যান্য কালচারাল সংগঠনও জুলাইকে নানাভাবে ধারণ করছে।
প্রশ্ন : জুলাইকে নিয়ে একেকজন একেক রকম মূল্যায়ন করে। আসলে জুলাই থেকে আমাদের কি শিক্ষা নেওয়া উচিত? এমন প্রশ্নের জবাবে শিবির সেক্রেটারি বলেন, জুলাইয়ে আমরা যারা রাজপথে নেমে এসেছিলাম, তারাতো ফ্যাসিবাদি শাসন কাঠামোর পরিবর্তন চেয়েছিলাম। যেটা আমাদের জন্য খুব জরুরি ছিল, যারা অপরাধী তাদের বিচার নিশ্চিত করা। অবশ্য ইন্টেরিম সরকার চেষ্টা করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা মনে করি এটা পর্যাপ্ত না। যেখানে খুব ষ্পষ্ট ভিডিও আছে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের কোন নেতা হামলা চালাচ্ছে; কোন কোন পুলিশ জনগণের ওপর জুলুম নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছে। যেসকল শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে, এগুলোর বিচার আমরা এখনো দেখিনি। এই বিচারগুলো যদি যথাযথভাবে করা হতো তাহলে আমার মনে হয়, অন্তত অপরাধীরা তাদের শাস্তি পেতো। আমাদের মুক্তি নিশ্চিত হতো বলে আমরা মনে করি। অপরাধীরাও ভয় পেতো যে সাধারণ জনগণের অধিকার খর্ব করলে বিচার হয়। আমরা মনে করছি যে এখনো সময় আছে সামনে।
জুলাই আন্দোলনে নিজের এবং সংগঠনের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে সিবগাতুল্লা বলেন, সব সময় আমরা থার্ড প্লান রাখতাম। দেখা গেছে সমনন্বয়করা একটা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে, আমরা কর্মসূচিটা বাস্তবায়নের জন্য ওদের মুখ থেকে ঘোষণা আসতো। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আমরা পেছন থেকে অনেকগুলো কাজ করতাম। আমরা যদি ১৬ তারিখের ঘটনা দেখি, চানখাঁর পুলে আমাদের একটা লড়াই ছিল শহীদ মিনারকে বাঁচানোর জন্য। ওদিক থেকে হাজি সেলিমের গ্রুপ আসছে, সে সময় ছাত্র শিবিরের মহানগরী উত্তর এবং মহানগরী পূর্বের নেতাকর্মীরা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে; যাতে হাজি সেলিমের গ্রুপ শহীদ মিনারে এসে আক্রমণ চালাতে না পারে। এরপর সাইন্সল্যাবে আমাদের মহানগর পশ্চিমের নেতৃত্বে ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ওইখানে কর্মসূচিতে ছিল; যাতে করে সবার দৃষ্টি সেদিকেও থাকে। তাদের ফোর্স যাতে দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। এভাবে আন্দোলনের প্রত্যেকটা স্তরে একটা প্লান যখন থাকতো; সমসাময়িক আরও কয়েকটা প্লান থাকতো ওটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য। এধরণের প্রোগ্রামগুলো আমরাই ডিজাইন করতাম। এটা ছিল আমাদের জন্য বড় জায়গা যে, আন্দোলনটাকে সফল করা। অনেক কিছু হয়তো বা তারা জানে না। তারা হয়তো শুধু ফোন দিয়েছে যে, হ্যাঁ আমরা জানাযা পড়বো ১৭ তারিখে, কফিন লাগবে। কফিন ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা কিন্তু কফিন ম্যানেজ করে দিয়েছিলাম। এভাবে আন্দোলনের প্রত্যেকটা জায়গায় আমরা ছিলাম। ঢাবির হল থেকে ছাত্রলীগকে বের করে দেওয়ার মধ্যেও আমাদের ভূমিকা ছিল। অনেক সময় সমন্বয়কারীরা সংবাদ সম্মেলনও করতে পারতো না। সেসময়গুলোতে আমরা লোকজন পাঠাই সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করার জন্য। এখনো দেখবেন ১৫ তারিখ রাতে তারা যখন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল; তখন পাশে আমাদের ভাইয়েরাই ছিল। মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা ছিল। ইন্টারনেট যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন মূল সমন্বয়ক যারা ছিল নাহিদ এবং আসিফ তারাও যখন ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন আমাদের টার্গেট ছিল পরের দিন কর্মসূচিটা ঘোষণা হবে। আলহামদুল্লিলাহ এই কর্মসূচি আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করি। তখন আমরা চারজন একসাথে ছিলাম। সেখানে আমি লিড দিচ্ছিলাম। আমরা ৯দফাটা রেডি করি। আগেই কিছু দফা রেডি করা ছিল, আমরা এটাকে প্রেসরিলিজ আকারে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। সেখানে যেটা হয়েছে, আমরা যখন বাটার সিগনালে একটা বিল্ডিংয়ে বসা আছি, সেখানে আমরা উপর থেকে দেখছি যে, ছাত্রলীগ যুবলীগ গুলী চালাচ্ছে। একপাশে জনতা, আমরা সেখানে বসে আন্দোলনের মেইন কাজটা করছিলাম। আগামী দিনের কর্মসূচিটা আমরা ঘোষণা করছিলাম। আমরা যখন বিল্ডিং থেকে নামলাম; দেখলাম একপাশে পুলিশ আরেক পাশে ছাত্রজনতা। আমরা পুলিশের সামনে পড়ে যাই। আমাদের হাতে তখন ৯ দফার কাজ প্রেস রিলিজ নিয়ে এগুচ্ছি। আমার তখন করার কিছু নাই। আমার হাতে প্রেসরিলিজ। পুলিশ যদি ধরে কিংবা গুলী করে। কিন্তু আমার কাজ হচ্ছে পত্রিকা অফিসে যেতে হবে। দিয়ে আসতে হবে। আমরা প্রেসরিলিজ কিছু প্রিন্ট করেছিলাম। কিন্তু তখন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে আমাদেরকে বের হয়ে পুলিশের সামনে দিয়ে যেতে হয়েছে। পুলিশ বলছিল যে আপনাদের কি জীবনের মায়া নেই? আমরা তখন কিছু বলিনি। আমাদের মনে ছিল যে কর্মসূচিটা ঘোষণা করতে হবে। পরবর্তীতে বাংলামোটরে একটা অফিসে আসি এবং প্রিন্ট করি। তখন আমাদের বেশ কয়েকজন ভাই, মহানগরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনকে ভাগ করে দেই যে কে কোথায় যাবে। সবাই পত্রিকা অফিসে গিয়ে ৯ দফার প্রেসরিলিজগুলো দিয়ে আসে। একইসময়ে আমরা চিন্তা করি যে, প্রধান সমন্বয়কদের বাইরেও আব্দুল কাদেরের মাধ্যমে দেওয়া হয়। আব্দুল কাদের আমার ডিপার্টমেন্টের ছোটভাই। এভাবেই আন্দোলন চলমান থাকে। ৯ দফা এমনভাবে ছিল এবং এমন কিছু জায়গা ছিল যে হাসিনার পক্ষে মানা সম্ভব না। কারণ আমরা হাসিনার সাইকোলজি জানতাম। হাসিনা এই বিষয়গুলো সহজে মানতে পারবে না। এর ফলে আন্দোলনটা চলমান ছিল। এরপর ২০ তারিখ,২১ তারিখ ,২২ তারিখ এমনকি প্রত্যেকদিন কি কর্মসূচি হবে, সেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে আমাদের নেতৃত্বে। আন্দোলনটা আমরা ধরে রাখতে পেরেছিলাম। আন্দোলনটা শুধু ঢাকা না, সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলাম। আমাদের সমন্বয়কদের প্রস্তুত রাখা ছিল। পরের স্তরে কে। আব্দুল কাদের গ্রেফতার হলে পরের স্তরে কে থাকবে। সিদ্ধান্তগুলো আমাদের এখানেই হচ্ছিল। তো আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম যে পরের স্তরে কে থাকবে। উদ্দেশ্য হলো আন্দোলন যাতে কেউ বন্ধ করে না দিতে পারে। সরাসরি পত্রিকা অফিসে পাঠানো হতো। ফোন থেকে মেসেজে খব যেতো। সাংবাদিকদের একটা অংশ আন্দোলনে বেশ বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছে। তারা অন্যদের ফরোয়ার্ড করতো। এভাবেই আন্দোলন চলমান ছিল। বিশেষ করে আমি যখন দেখি ১৮,১৯ জুলাই এতো গণহত্যা হয় ঢাকাতে। পরে দেখলাম যে ঢাকার বেশ কয়টা জায়গায় আন্দোলন চলমান আছে। ঢাকা শহরে প্রত্যেকটা স্পটেই আন্দোলন চলছে। প্রত্যেক স্পটে আমাদের লোকজন আছে। আমরা খবর পেতাম। মহাখালি, তেজগাঁও, রামপুরা, বাড্ডায়,বসুন্ধরায়, শাহবাগ, সাইন্সল্যাব, বাটার সিগন্যাাল, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলি, মিরপুরেও আমাদের লোকজন আছে। যাত্রাবাড়িতো আগেই স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় আমি একটা পরিকল্পনা করে ফেলি। সেটা ছিল গণভবন কেন্দ্রীক। গণভবনের প্রত্যেকটা সাইডে আন্দোলন ছড়িয়ে দেই। যেখান থেকে আমাদেরকে মারার হুমকি দেয়া হচ্ছে, মারার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, আমাদের সেই ভবনের দিকে এগুতে হবে। একথা মাথায় রেখে আমরা একটা ছক তৈরি করি। এই ছকটা আমাদের দায়িত্বশীল এবং জনশক্তিেেদর বোঝাই। কে কিভাবে আন্দোলন করবে, কোন স্পটের সাথে কোন কোন কলেজ যুক্ত হবে। এগুলোই আমাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়। সেখানে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা আসতো, আমাদের ভাইয়েরা আসতো। দেখা গেছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও আসতেন। আল্টিমেটলি গণভবন কেন্দ্রীক ছক করে আন্দোলন করে এগিয়ে যাই। শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট শক্তি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ইন্টারনেট না থাকা সময়টায় আমরা মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম। আমার সাথে থাকতো রেজাউল করিম শাকিল। তার নেতৃত্বে আমরা ঘুরতাম। তাকে সামনে রেখে আমি পেছনে। বিশেষ করে রাতের বেলায মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম। দেখতাম কোন এলাকাতে কোন অবস্থা। আওয়ামী লীগের মনোবল কতটুকু আছে। দিনের বেলায় মোটর সাইকেলে করে রাস্তায় থাকা মানুষের অফলাইন নাম্বার সংগ্রহ করতাম। তাদের সাথে কথা বলতাম। কে কোথায় কিভাবে আছে। ঢাকার বাইরেও রাজশহিী চট্টগ্রামেও যোগাযোগ করা হতো। দায়িত্বশীলদের সাথে আমরা কথা বলতাম অফলাইন নাম্বারে। অফলাইন নাম্বারের পাশাাপাশি আমাদের একটা গ্রুপ পাঠিয়েছিলাম ভারতীয় সীমান্তে। সেখান থেকে ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থাগুলো জানান দেওয়া হতো। বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতে পাঠানোর জন্য আব্দুল কাদেরের ভয়েস রেকর্ড করে তার ভিডিও রেকর্ড করে আমরা এএফপির অফিসে পর্যন্ত পাঠিয়ে ছিলাম। এভাবে দেশে বিদেশে একটা চমৎকার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলাম।
প্রশ্ন : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিভাবে আন্দোলনে যুক্ত করলেন? এমন প্রশ্নে জুলাই আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক সিবগা বললেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আসলে সচেতন। ১৭ জুলাই যখন আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য করা হয়; তখনই যাত্রাবাড়িতে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে আমাদের সাংগঠনিক দায়িত্বশীল যারা ছিলেন এবং আমরা সমন্বয় করে দিয়েছিলাম। আর সারাদেশে যে সমন্বয়ক দেওয়া হয়েছিল তা আমাদের হাত ধরেই দেওয়া হয়েছিল। কারণ সমন্বয়কদেরতো খুব একটা যোগাযোগ ছিল না যে রাজশাহীতে কে আছে আর রংপুরে কে আছে। এটাতো আমাদের ছিল। সেক্ষেত্রে আমরা যেটা করতাম সেটা হলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা অ্যাকটিভিজম করে তাদের এই গ্রুপগুলোতে নিয়ে আসলাম। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৮ জুলাই রাস্তায় নেমে গেলো এবং তারা সফলভাবে আন্দোলনটা করেছে। দুই দিক থেকে যখন পুলিশকে ধাওয়া দিয়েছে তখন পুলিশ বাধ্য হয়েছে বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারে করে পালাতে। এতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কনফিডেন্ট অনেক বেড়ে যায়। সেসব জায়গাতে আমাদের ভাইয়েরা ছিল। সাধারণ মানুষ নেমে এসেছিল। পুলিশ আওয়ামী লীগ আমাদের মেরেছে কিন্তু আমরা রাজপথ ছাড়িনি। এভাবেই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে।