বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটে পাওয়া জনরায় কার্যকর না করে সরকার ভুল পথে হাঁটছে। জুলাই সনদের আইনগত ভিত্তি তৈরির পরিবর্তে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, গণভোটের পর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে বিএনপি শুরু থেকেই একমত ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা রাষ্ট্রপতির আদেশ, গণভোট ও জুলাই সনদের বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করছে। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও দ্বিচারিতার শামিল। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের রায় জাতীয় সংসদে বাস্তবায়ন না হলে বিষয়টি জনগণের কাছেই নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সরকার দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গতকাল বুধবার রাতে ১১ দলীয় ঐক্য খুলনার উদ্যোগে খুলনা প্রেসক্লাব ব্যাংকুয়েট হলে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা : সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবিতা বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ প্রফেসর।

মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট শাহ আলমের পরিচালনায় প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতী শরীফ সাঈদুর রহমান, এনসিপি খুলনা মহানগর প্রধান সংগঠক আহমদ হামীম রাহাত, বাংলাদেশ লেবার পার্টির খুলনা মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ এস এম সাইফুদ্দোহা, খেলাফত মজলিসের খুলনা মহানগর সভাপতি এফ এম হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি কেন্দ্রীয় সদস্য মো. জাকির হোসেন খান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো. ইব্রাহিম খলিল, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) খুলনা মহানগর দপ্তর সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি খুলনা মহানগর সভাপতি এডভোকেট হানিফ উদ্দীন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মাহমুদ হাসান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি মো. রাকিব হাসান। এ মঞ্চে জুলাই শহীদ সাকিব রায়হানের গর্বিত পিতা শেখ মো. আজিজুর রহমান ও মাতা নূরুন্নাহার বেগম উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে মহানগরী নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, অফিস সেক্রেটারি মিম মিরাজ হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য ড. আবু রুবাবা, তারবিয়াত বিভাগের সেক্রেটারি মাওলানা শেখ মোহাম্মদ অলিউল্লাহ, সমাজ কল্যাণ বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, প্রচার সেক্রেটারি মো. আব্দুল গফুর, মাওলানা শাহারুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার মোল্লা আলমগীর, মহানগরী যুব বিভাগের সভাপতি মুকারম বিল্লাহ, মহানগরী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন, খুলনা সদর থানা আমীর এস এম হাফিজুর রহমান, সোনাডাঙ্গা থানা আমীর জি এম শহীদুল ইসলাম, খালিশপুর থানা আমীর আব্দুল্লাহ আল মামুন, দৌলতপুর থানা আমীর মুশারফ আনসারী, আড়ংঘাটা থানা আমীর মনোয়ার আনসারী, হরিণটানা থানা আমীর সেলিম বাহার, লবণচরা থানা আমীর মোজাফফর হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, মাওলানা আরিফুল ইসলাম ভুইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে কবিতা আবৃতি করেন দেশজ খুলনা সেক্রেটারি গাজী শাহ মাখদুম। কুরআন তেলাওয়াত করেন ড. মো. তহিরুল আহসান তোহা। সেমিনারে ইসলামী গান পরিবেশন করেন প্রেরণা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ খুলনার শিল্পীবৃন্দ। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা, আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধনের জন্য যে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, সেটি প্রকৃত অর্থে সংস্কারের উদ্যোগ নয়। তাঁর মতে, বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদের ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয়ে সমর্থন দিয়েছেন বলে তাদের দাবি। সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো সরকারের দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ভিন্নমত থাকার কারণে সরকার পুরো সনদ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসছে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী কাঠামো পরিবর্তন করে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সরকার সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সেমিনারে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, আন্দোলনে বহু মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার যে ত্যাগ রয়েছে, তার প্রতি সম্মান জানাতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সংস্কারের গণদাবি উপেক্ষা করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে।

তিনি জানান, জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংস্কার নয়, প্রকৃত অর্থে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এ লক্ষ্যে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, লিফলেট বিতরণ, মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের কাছে তাদের অবস্থান তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রধান অতিথির আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশ, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই প্রক্রিয়া অস্বীকার করছে, যা জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলটি গণভোট, রাষ্ট্রপতির আদেশ ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপি ‘চার মাস আগে তারা এসব বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।’

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার যে সংবিধান সংশোধনের বিল এনেছে, সেটি প্রকৃত অর্থে সংস্কারের উদ্যোগ নয়। তিনি সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘সংসদে যদি এ সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে জনগণের কাছেই যেতে হবে। যে সমাধান সংসদে হওয়ার কথা, সেটি রাজপথে জনগণকে আদায় করতে হতে পারে। তবে সেটি কতটা শান্তিপূর্ণ হবে, তা বলা যায় না। এতে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।’

সংঘাত এড়াতে বিএনপিকে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণভোটে যে ৭০ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিয়েছে, তাদের রায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তা না হলে সংঘাত এড়ানোর আর কোনো বিকল্প থাকবে না।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, জুলাই সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত থাকলেও গণভোটে জনগণ পুরো ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয়েই সমর্থন দিয়েছে। তাই নির্বাচনের পর কোনো রাজনৈতিক দল নিজের সুবিধামতো কিছু অংশ গ্রহণ করে বাকি অংশ উপেক্ষা করতে পারে না।

তার অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে চায়, কারণ সেগুলো বাস্তবায়িত হলে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের সুযোগ সংকুচিত হবে’। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছি। জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে সেটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।’

বিশেষ অতিথি মাওলানা এমরান হুসাইন বলেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ যেন বিস্মৃত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’

সেমিনারে অন্যান্য বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের ন্যায্য অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের ত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে ন্যায়বিচার, সুশাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং ইসলামী আদর্শভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের নেতৃত্বকে সরানো গেলেও তার ন্যারেটিভ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়ে সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে

উপেক্ষা করা হচ্ছে। বিদ্যমান সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যদি দুর্নীতি, বৈষম্য, দমন-পীড়ন রোধ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সক্ষম হতো, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ত না। আন্দোলনের লক্ষ্যই ছিল এসব কাঠামোগত সংকটের সমাধান নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়; বরং দেশ, জাতি এবং জনগণের কল্যাণে বাস্তবায়িত হওয়াই সময়ের দাবি। শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও নৈতিকতাসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।