খুলনা ব্যুরো
বহু বছরের পুরোনো মাটির বাঁধ, অকার্যকর স্লুইস গেট আর বারবার সংস্কারের পরও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আবারও ঝুঁকির মুখে। বর্ষা নামলেই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম ঝুকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। আকাশে কালো মেঘ জমে, নদীতে জোয়ার বাড়ে, আর উপকূলজুড়ে শুরু হয় অপেক্ষা, কোথায় এবার বাঁধ ভাঙবে।
খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজেরা বানু বলেন, আগের ভাঙনে সব হারাইছি। অনেক কষ্টে আবার ঘর তুলছি। এখন আবার বাঁধ ভাঙতেছে। রাত হইলেই ভয় লাগে। গত পাঁচ বছরে তিনবার নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তিনি। এবারও নতুন ভাঙনের শঙ্কায় দিন কাটছে তার পরিবারের। হাজেরা বানুর গল্প একার নয়। উপকূলের হাজারো পরিবারের বাস্তবতা এখন একই বাঁধ টিকবে, নাকি ঘর যাবে এই অনিশ্চয়তায় বসবাস।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দপ্তরের তথ্য বলছে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা, এই তিন জেলায় মোট বেড়িবাঁধ রয়েছে ২০২২ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে বর্তমানে ১০৭ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্কার কাজ শুরু হলেও তার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
খুলনায় মোট ১০১৩ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে ৪১ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে সংস্কার হচ্ছে ১৯ দশমিক ৬০৯ কিলোমিটার। বাগেরহাটে ৩৩৮ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ১১ দশমিক ৮৪৭ কিলোমিটার ঝুঁকিতে থাকলেও সংস্কার হচ্ছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯০০ কিলোমিটার। সাতক্ষীরায় মোট ৬৭১ দশমিক ১৭০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৭২৫ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। কাজ চলছে ১৪ দশমিক ৭২০ কিলোমিটার এলাকায়। সব মিলিয়ে এখনও ৭২ দশমিক ১২১ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকির মধ্যেই রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খুলনার দাকোপ উপজেলার জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষীখোলা, নলডাঙ্গাসহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে তীব্র ভাঙন চলছে। তিলডাঙ্গা ইউনিয়নে শিবসা ও ঢাকী নদীর মোহনায় প্রতিদিন ভাঙছে নতুন এলাকা। ঝুঁকিতে রয়েছে বটবুনিয়া গ্রাম, কামিনীবাসিয়া, ঝালবুনিয়া, পুরোনো পুলিশ ফাঁড়ি এলাকা এবং আঁধারমানিক–নলডাঙ্গা সড়ক। স্থানীয় বাসিন্দা আফসার বলেন, আমার ৫বিঘা জমি নদীতে গেছে। শেষ জমিটাও ব্লক বানানোর জন্য দিছি। এখন নদীর পাড়ে থাকি।
একই চিত্র পাইকগাছার দেলুটি, লতা, পাটকেলপোতা ও কুমখালী ইউনিয়নে। কুমখালীর শান্তা লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় শিবসা নদীর পাড়ে বড় ফাটল দেখা গেছে। স্থানীয় ইমরান শেখ বলেন, পূর্ণিমার জোয়ার মানেই ভয়। পানি ঢুইকা গেলে সব শেষ। কয়রার মহেশ্বরীপুর, কাশির হাটখোলা, দশহালিয়া, পবনা, শেওড়া ও হরিণখোলার মানুষও একই উদ্বেগে। হামিদা বেগম নামে এক নারী বলেন, ৩ বিঘা জমি গেছে। ক্ষতিপূরণও পাইনি।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরেও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অভিযোগ ও মাঠতথ্যে উঠে এসেছে নদীভাঙনের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানবসৃষ্ট কিছু কারণও কাজ করছে। একশ্রেণির ব্যক্তি চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ কেটে বা নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে নোনা পানি প্রবেশ করান। কোথাও কোথাও বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বাঁধ ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পাউবো সূত্র বলছে, পাকিস্তান আমলে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ১৪৪ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২৭ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। তবে এর মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ কিলোমিটার এখনো মাটির বাঁধ। কংক্রিট সুরক্ষা রয়েছে মাত্র ৪৫ কিলোমিটারে।
উপকূলের আরেক বড় সংকট পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। খুলনা অঞ্চলে পাউবোর মোট ৫৯৮টি স্লুইস গেটের মধ্যে প্রায় ২৫০টি বর্তমানে অকার্যকর। এর মধ্যে ২৪৮টি জরাজীর্ণ এবং ৫৯টি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বটিয়াঘাটার শোলমারি এলাকার ১০ ভেন্টের স্লুইস গেটটি বিল ডাকাতিয়াসহ ২৬টি বিলের পানি নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারের কয়েক মাসের মধ্যেই পলি জমে আবার অকার্যকর হয়ে পড়ে এটি। কৃষকদের ভাষ্য, গেট সচল রাখার জন্য কেনা ড্রেজার বহু বছর ধরে ব্যবহার হয়নি।
স্থানীয় সমাজসেবক মঈনুর রহমান মঈন বলেন, ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে। টেকসই বাঁধ ছাড়া বিকল্প নেই।
বাপার খুলনা জেলা সমন্বয়ক এডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, খ-িত প্রকল্প নয়, বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, পরিবর্তিত ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা না করলে কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি সংস্কার চলছে। স্থায়ী প্রকল্পও নেওয়া হচ্ছে।
পাউবোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বি এম মোমিনউদ্দিন বলেন, পলি অপসারণ ও গেট সংস্কার অব্যাহত আছে।
খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ খান বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার নদীভাঙনের করুণ চিত্র আমি সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম বলেন, শরণখোলায় ৩৫/১ এর পোল্ডারে বলেশ্বর নদীর বরইতলা ও গাবতলায় দুটি স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রয়েছে। বর্ষাকালে যেকোনো সময় ভেঙে গেলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। এছাড়া মোড়েলগঞ্জের সন্ন্যাসী লঞ্চ ঘাট থেকে বহুরবুনিয়া ইউনিয়নের ঘষিয়াখালী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। উপকূলে প্রতি বছর নতুন প্রকল্প আসে, নতুন বরাদ্দ হয়, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বর্ষা এলেই আবার সামনে আসে পুরোনো প্রশ্ন, এই বাঁধ কি এবার টিকবে? কারণ উপকূলের মানুষের কাছে এটি শুধু অবকাঠামোর সংকট নয়; এটি ঘর, জমি, ফসল, জীবিকা আর টিকে থাকার লড়াই।