বাড়তে পারে লোডশেডিং-

স্টাফ রিপোর্টার

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকা-ের পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি ও বিদ্যুৎখাতে ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস সংকট আরও অন্তত দুই সপ্তাহ থাকতে পারে, বাড়তে পারে লোডশেডিং।

গত কয়েকদিনে দেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। কোথাও অনুমোদিত লোড অনুযায়ী গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন নেমেছে মোট সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশে। গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কারখানার বিভিন্ন মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিল্প মালিকদের আর্থিক ক্ষতি।

গতকাল রোববার সচিবালয়ে জ্বালানি সংকট সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। দেশের মাটির নিচ থেকে যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে সেটি আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এই দুটি এফএসআরইউ দিয়ে এর বেশি এলএনজি আমদানি করা সম্ভব নয়। ফলে রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটিজনিত অগ্নিকান্ডের কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও কেবল প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। এ কাজে বিদেশি প্রকৌশলীরা যুক্ত রয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও অন্যান্য কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগতে পারে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। অন্যদিকে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঘাটতি প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে টার্মিনালটি আংশিক চালু করা সম্ভব হলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে পরদিনের খাবার একসঙ্গে রান্না করে রাখছেন।

গ্যাসের স্বল্পতার প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী থেকে জেলা শহর সবখানেই অনেক স্টেশন পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় সীমিত সময় পরিচালিত হচ্ছে। যেসব স্টেশনে গ্যাস মিলছে, সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, স্বাভাবিকভাবে একটি স্টেশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চাপের তুলনায় বর্তমানে অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম। ফলে স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে। কোথাও বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিল্প উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে বড় ধরনের লোডশেডিং এড়ানো গেলেও আগামী দিনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শিল্পকারখানা পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে লোডশেডিংও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার আগে গড়ে প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট ছিল। এর ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তিতাসের অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘গ্যাসের চাপ আসে গ্যাসের সরবরাহ থেকে। লাইন যখন প্যাকড থাকে তখন প্রেশারটা ভালো থাকবে। যখন লাইন প্যাকড থাকবে না, ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই কম থাকে তখন লাইন ফল করবে। প্রেশার জেনারেট করে গ্যাসের সরবরাহ। সরবরাহ কম এজন্য গ্যাসের প্রেশার পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিতাস এখন ১২শ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চাহিদা ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুট। এফএসআরইউ ঠিক হলেই সংকট কেটে যাবে বিষয়টি এমন নয়। এফএসআরইউ নষ্ট হওয়ার আগে আমাদের দেওয়া হচ্ছিল ১৫শ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৪শ মিলিয়ন বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে যাচ্ছে জানিয়ে বলেন, ‘সেখানে অন্য সেক্টরের জন্য আমার থাকে ১৩শ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে প্রয়োজন মিনিমাম ১৪শ মিলিয়ন ঘনফুট। এজন্য ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এমনিতেই সংকট থাকবে।’

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এফএসআরইউ কবে নাগাদ ঠিক হচ্ছে সেটি এখনো বলতে পারছি না। বিদেশি প্রকৌশলীরা এসেছেন, তারা কাজ করছেন। এই মুহূর্তে ঠিকঠাক করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’