মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। এ কথাগুলো শুনতে ভালো লাগে, ভাবতেও ভালো লাগে। কিন্তু মানব সমাজের বাস্তব চিত্রটা এখন কেমন? মানুষ এখন মানুষের জন্য কতটা ভাবে? মানুষ তো সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের লক্ষ্যে সমাজবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সমাজ তাদের আশা পূর্ণ করতে পারেনি। সমাজে এখন আস্থার অভাব। আস্থার জন্য যে বিশ^াস ও নৈতিকতা প্রয়োজন তার ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সমাজে। ফলে মানুষ এখন মানুষের পাশে দাঁড়ায় না, সংকটে হাত বাড়িয়ে দেয় না। এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। তারা সংগঠিত হয়ে মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। লুন্ঠন, হত্যা এমনকি ধর্ষণের মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এদের শাসন করবে কে? দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্যই তো গঠিত হয় সরকার ও প্রশাসন। এসব তো গঠিত হয় কিন্তু তেমন কার্যকর হয় না। ফলে রাজনীতি এখন ইমেজ সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা এখন রাজনীতি বিষয়টি ভালোই বোঝে। বুঝে বলেই তো সংঘটিত হলো গণঅভ্যুত্থান। আশেপাশের দেশগুলোর চিত্রও একই রকম। শ্রীলংকা ও নেপালেও আমরা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চিত্র লক্ষ্য করেছি। বিশাল দেশ ভারতেও আমরা প্রথাগত রাজনীতি, দুঃশাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ক্ষুব্ধ আওয়াজ লক্ষ্য করছি। রাজনীতিবিদরা তো বহু আগে থেকেই নাগরিকদের সাথে চালাকি করে আসছিলো। তাদের দুঃশাসন, বঞ্চনা ও অপমান তো মানুষ দীর্ঘকাল বয়ে বেড়াবে না। বঞ্চিত ও দুঃখী মানুষ তো বিচারের জন্য আদালতে যেতে চায়। কিন্তু আদালতের শীর্ষ বিচারকও যদি দুঃখী বঞ্চিত মানুষদের অবজ্ঞা ও অপমান করে তখন মানুষ কোথায় যাবে? বেঁচে থাকার জন্য তো তাদের কিছু একটা করতে হবে। বড় কিছু করার তো তেমন ক্ষমতা নেই। তবে ব্যঙ্গাত্মক কৌশল ও প্রতিবাদের ভাষা তো বঞ্চিত জনতার আছে? বিচারের বাণী যখন নিভৃতে কাঁদে তখন এ পথেই তাদের যেতে হয়। ভারতে আমরা তেমন দৃশ্যই লক্ষ্য করলাম।

গত মাসে ভারতের একজন শীর্ষ বিচারক দেশের বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবীর’ সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এর ফল কি হতে পারে। বিচারকের ওই তুলনা ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে বিশাল বিক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে অনলাইনের এটিই এখন প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় ঘটনা। দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আনলাইনে রীতিমত ঝড় তুলেছে। প্রথমবারের মতো রাজপথের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিতে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে নয়াদিল্লিতে এসেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সি অভিজিৎ দীপকে। দ্য টেলিগ্রাফকে দীপকে বলেন, ‘রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে আমরা শুধুই ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ। আমরা তুচ্ছ, সহজেই অবহেলাযোগ্য ও পুরোপুরি আবর্জনার মতো। তবে তেলাপোকা সব পরিবেশেই টিকে থাকে। আপনারা আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলতে পারবেন না।’ উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের অবজ্ঞাসূচক বক্তব্যের পর অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে তিনি নাম রেখেছেন ‘সিজেপি’। উল্লেখ্য, এক শুনানিতে বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেছিলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পান না কিংবা পেশাগতভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মী বনে যান, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী হন, আবার কেউ তথ্য অধিকারকর্মী বা অন্য কোনো ধরনের অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেন।’ তার এ অপমানজনক কথা তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং তারা হয়ে ওঠেন প্রতিবাদমুখর। নিছক ব্যঙ্গ থেকে শুরু হওয়া তৎপারতা এখন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত অনলাইন আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শুধু ইনস্ট্রাগামেই ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ এই দলের অনুসারী। এটি তরুণ ভারতীয়দের চরম হতাশার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক নেতারা তাদের এড়িয়ে চলছেন। সিজেপি নেতা দীপকে বলেন, তার দল ‘অলস, বেকার ও চিরসত্যবাদীদের’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারতের ১৪২ কোটি মানুষের অর্ধেকের বেশির বয়স ৩০ বছরের নিচে। এ তরুণদের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠাই তার দলকে এগিয়ে নিচ্ছে। দেশের পরীক্ষাব্যবস্থায় চলমান সংকট তরুণদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী ভীষণ প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেন। সরকারি চাকরি পাওয়া কয়েকটি উপায়ের এটি একটি। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, নম্বর দেওয়ার ভুল ও কারিগরি ত্রুটি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনাকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা হিসেবে দেখছেন। দীপকে বলেন, এসব ব্যর্থতা তরুণদের গভীর হতাশাকে উন্মোচিত করেছে, যা শুধু পারীক্ষার গণ্ডিতে আটকে নেই। দীপকের মতে সিজেপি আন্দোলন মূলত বেকারত্ব, গণতন্ত্রের পাতন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বড় ধরনের অসন্তোষের প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ভারতের তরুণরা আজ নিজেদের চরম অবহেলিত ভাবছেন। আমাদের দেশে এখন রেকর্ড বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি কলুষিত হয়ে গেছে।’ দীপকে বলেন, এসব সমস্যা এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। আর এর বিস্ফোরণ ঘটেছে পরীক্ষার নানা কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে। মানুষ এখন শুধু হতাশাই নয়, বরং তারা দেখছে যে, সরকার ও নেতৃত্ব এসব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না।

ককরোচ জনতা পার্টি তথা সিজেপির নেতা আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সময়ের এই কথাগুলো বলেছিলেন গত শনিবার নয়াদিল্লিতে পাার্লামেন্ট ভবনের কাছে। প্রতিবাদ স্থলে জড়ো হয়েছিলেন শত শত তরুণ। তাদের অনেকের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড ও তেলাপোকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলার পর এটিই ছিল সিজেপির প্রথম রাজপথের কর্মসূচি। ৭ জুন রোববার আয়োজিত তাদের এই বিক্ষোভ সমাবেশের প্রধান দাবি ছিল ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ‘ককরোচ প্রতীক নিয়ে সিজেপি শুধু ব্যঙ্গই করেনি; তরুণদের প্রতি, গরিবদের প্রতি রাষ্ট্রব্যবস্থার যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও বৈষম্য, তার বিরুদ্ধে জানিয়েছে তীব্র প্রতিবাদও। সাথে এই বার্তাও ছিলÑ ছোটরা ঐক্যবদ্ধা হলে অনেক বড় হয়ে যায়। অতএব দরিদ্র ও বেকার তরুণদের তেলাপোকা বলে তোমরা ‘বড়’ হতে যেও না। দায়িত্ব পাালনে ব্যর্থ বড়রা কখনো সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে।