॥ মুঃ শফিকুল ইসলাম ॥

বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ সংকট নতুন কিছু নয়; তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সমস্যাটি এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই-এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার জটিল রূপ নিয়েছে। নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট-এ তিন উপজেলায় কৃষকের প্রধান অভিযোগ, সেচের পানি থাকা সত্ত্বেও তা তাদের নাগালে নেই।

বরেন্দ্রভূমির ভৌগোলিক বাস্তবতায় নদীর অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সে ঘাটতি পূরণে পুকুর খনন ও গভীর নলকূপ স্থাপন ছিল সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে-পুকুরগুলো যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে লিজ দেওয়া হয়, তখন তা কৃষকের জন্য উন্মুক্ত থাকে না। ফলে জনস্বার্থে খনন করা জলাধার পরিণত হয় সীমিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন সম্পদে। প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্রীয় অর্থে তৈরি এ জলাধার কি কেবল লিজগ্রহীতার মুনাফার জন্য?

অন্যদিকে, টিউবওয়েলনির্ভর সেচ ব্যবস্থাও টেকসই সমাধান হয়ে উঠতে পারেনি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ ব্যবস্থার কার্যকরিতা কমে যাচ্ছে। ফলে কৃষক এক ধরনের ‘দ্বিমুখী সংকটে’ পড়েছেন-পুকুরের পানি ব্যবহার করতে পারছেন না, আবার টিউবওয়েল থেকেও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে ডা. মিজানুর রহমান পুকুর লিজ বন্ধ করে কৃষকদের সেচে ব্যবহারের দাবি তোলা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে শুধু দাবি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতিগত পরিবর্তন। পানি ব্যবস্থাপনায় ‘অধিকার’ বনাম ‘বাণিজ্য’-এ দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি। অথচ সে কৃষিই যদি পানির অভাবে বিপর্যস্ত হয়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন-পুকুর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, কৃষকদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সেচ প্রযুক্তি যেমন সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারে জোর দেওয়া। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক কোনো দান নয়, ন্যায্য অধিকার চাইছেন-পানির অধিকার। সে অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন প্রশ্ন, নীতিনির্ধারকরা কি সেই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত?

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।