ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষ খাদ্যসঙ্কটে, জাতিসঙ্ঘের এএ একটি সতর্কবার্তা যখন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে ঠিক সেই সময়ে ইরানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার ইসরাইল হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার এ মুহূর্তে ইরানে নতুন হামলা না চালাতে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ইসরাইলকে হামলা না করতে বললেও আমেরিকাই ইরানে নতুন হামলা চালায় বলে খবর। বুধবার দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ‘দায়ে’ বুধবার ভোরে দক্ষিণ ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। মার্কিন সামরিক বাহিনী এ হামলাকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করলেও ইরান একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি অঞ্চল জুড়ে এখন দু’পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে এবং এর আগে তারা বুশেহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছে। আইআরজিসি ও খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দফতরের পক্ষ থেকে এ যৌথ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রায় দু’মাসের বিরতির পর গত রোববার দিবাগত রাতে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এরপর সোমবার সকাল পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে। এদিকে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একাধিক বার্তা দিয়ে উভয় দেশকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানান। জানা যায়, বৈরুতে ইসরাইলের হামলার জবাবে রোববার রাতে উত্তর ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর পরপরই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপ হয়। ওই আলোচনায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালালে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাতে পারে বলে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, আমি নেতানিয়াহুকে বলেছি, সতর্ক থাকতে হবে। অন্যথায় খুব দ্রুতই তোমরা একা হয়ে যেতে পারো। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের এ বক্তব্য অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু নতুন মার্কিন হামলা সেই কথার প্রতিধ্বনি করে না বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
শুরুতে বলছিলাম ইরান যুদ্ধের কারণে জাতিসঙ্ঘের বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সঙ্ঘাত লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার ঝুঁকিতে ফেলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ডব্লিউএফপি বলেছে, তেলের দামের ওপর এ সঙ্ঘাতের প্রভাব অব্যাহত থাকায় তা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ‘ভয়ঙ্কর পরিণতি’ বয়ে আনবে। মার্চ মাসে করা সে পূর্বাভাস সত্যি হতে শুরু করেছে। বলা হয়েছিল জুনের শেষ নাগাদ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে থাকলে ৪.৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসঙ্কটে পড়বে। আফগানিস্তান, সোমালিয়া এবং শ্রীলঙ্কার পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আয় হ্রাস এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ার কারণে তারা ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। সোমালিয়ায় ৬৫ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হবে, আফগানিস্তানে ২৩ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে পারে, শ্রীলঙ্কায় ১৩ লাখ মানুষ তাদের মৌলিক খাদ্যচাহিদা মেটাতে না পারার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ সঙ্ঘাত ছয় মাস ধরে চললে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।’
যুদ্ধের ১০০ দিন অতিক্রম : সামনে কী?
ইতোমধ্যে এ যুদ্ধ ১০০তম দিন অতিক্রম করেছে ও সাম্প্রতিক এ হামলার ফলে গত ৮ এপ্রিল থেকে চলমান নাজুক যুদ্ধবিরতি আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে সঙ্ঘাত শেষ করতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও তা এখনো সফল হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে সামনে কি? ইরানের সঙ্গে কি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই চুক্তি করবে? এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দোটানা রয়েছে।
দু’পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া নানা বিতর্ক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে শান্তি আলোচনা পুরোপুরি থমকে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় বলেছিলেন, এটি ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে। কিন্তু সে যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলো গত রোববার। এর মধ্যেই হাজারো মানুষের প্রাণহানি, লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে একাধিক দফার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
নিহত অন্তত ৭ হাজার : প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লেবাননে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৫৯৩ জন। ইরানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬৮। উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিহত হয়েছেন ২৯ জন। এ ছাড়া, ইরানি হামলায় ২৬ জন ইসরাইলি নাগরিক ও ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। সংঘাত চলমান থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবিক সংকট : এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে লেবাননে। গত ১৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া পৃথক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ হামলায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বহু শহর ও গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে ‘পোড়ামাটি নীতি’ এবং ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানে ৩০ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত : যুদ্ধের প্রথম দু’সপ্তাহেই ইরানে তিন মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধে ক্ষতি : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ এ পথ দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ আটকে পড়ে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের মজুত দ্রুত কমতে থাকে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। এ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশও। তেলের সংকটে যান চলাচল ব্যাহত হয়, জ¦ালানি মূল্য বৃদ্ধি পায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা রেমিটেন্স আহরণকারীরা সংকটে পড়েন।
এ যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এ পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ধাক্কাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে। যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কিছু কমে। বুধবার জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মজুত কমে আসায় তেলের দাম আবারো বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৬ সেন্ট বা ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯২ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের মধ্যে দু’দফা বড় ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে। ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরিকল্পনা ছিল সংঘাত থামিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা। কিন্তু যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে ১০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায়ও কোনো অগ্রগতি হয়নি। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিস্তারিত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অর্জন করা এখনও অত্যন্ত কঠিন। কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো চুক্তি মেনে চলবে কি না, সে বিষয়েও তাদের গভীর সন্দেহ রয়েছে।
রাজনৈতিক চাপে ট্রাম্প : এ যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাবও যুক্তরাষ্ট্রে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ২ জুন পর্যন্ত রিয়েল ক্লিয়ারপলিটিকসের গড় জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদন হার নেমে এসেছে ৪০ দশমিক ৩ শতাংশে। অন্যদিকে তার কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
আশার আলো নেই, তারপরও যুদ্ধের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালু হয়েছে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব থেকে হাজিদের বহনকারী কয়েকটি ফ্লাইট সেখানে অবতরণ করেছে, যা বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান জানিয়েছে, জব্দ করা অর্থ ফেরত ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়; পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন খসড়া সমঝোতায় অগ্রহণযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হলে তা আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এ টানাপোড়েনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন ইরানি কর্মকর্তা। তার মতে, ওয়াশিংটন খসড়া সমঝোতাপত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে, যা ইরানের পক্ষে কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। ইরানের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় তেহরান যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না, সেটি তার বক্তব্যে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। নতুন করে হামলা ও পাল্টা হামলা সংকটকে ঘনীভূত করে তুলেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।