আসিফ আরসালান

একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে যে আমাকে লিখতে হবে, সেকথা ইতিপূর্বে আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন দেখছি সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী যেসব কাজ কারবার করছেন সেগুলো দেখে ঐ বাগধারার কথাটিই মনে হচ্ছে। আর সেটি হলো, ‘১২ হাত কাঁকুড়ের ১৩ হাত বিচি’। আবার অনেকে বলেন,‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’। এখানে বলে রাখছি যে, অনেকে লেখেন, ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়ো’। আসলে এটি ঠিক নয়। যারা এখনো এ প্রবন্ধটি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন তারা মূল বাগধারাটি চেকাপ করে নিতে পারেন। যা’হোক, এর আগে এই প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেসব খবর ছাপা হয়েছিলো সেগুলোর রেশ কাটতে না কাটতেই একটি নতুন খবর এসে হাজির হলো। আজ এ লেখার শুরুতেই ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণীর বাংলা দৈনিকের অনলাইন ভার্সনের একটি খবরের ওপর চোখ পড়লো। খবরটির শিরোনাম, ‘প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের চাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ‘না’, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ বদলাচ্ছে না’। খবরে বলা হয়েছে, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া নতুন রেলপথ কোন দিক দিয়ে কোন পর্যন্ত যাবে, আগে থেকেই নির্ধারণ হয়ে আছে। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নতুন রেলপথে কিছুটা পরিবর্তন আনতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর সে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাকচ করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, এটি পরিবর্তন করা যাবে না। আগে থেকে ঠিক করা পথ (রুট) ধরে রেললাইন বসবে।

বর্তমান সরকার সিরাজগঞ্জ বগুড়ার মধ্যে নতুন ৭৬ কিলোমিটার মিশ্র গেজ (মিটারগেজ ও ব্রডগেজ) রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এ রেলপথ নির্মাণ হলে সিরাজগঞ্জ থেকে রেলপথে বগুড়ার দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে যাত্রার সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে আসবে। এখন ট্রেনে ঘুরপথে বগুড়ায় যেতে হয়। ঢাকা থেকে ট্রেন সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর হয়ে সান্তাহার দিয়ে বগুড়া শহরে যায়। নতুন রেললাইন হলে ট্রেন সিরাজগঞ্জ থেকে কামারখন্দ, রায়গঞ্জ, শেরপুর, শাজাহানপুর ও কাহালু হয়ে বগুড়া শহরে যাবে।

নতুন রেলপথটি সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার রানীরহাট হয়ে বগুড়া শহর পর্যন্ত যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চেয়েছিলেন, নতুন রেলপথটি বগুড়া শহর অবধি না নিয়ে রানীরহাট থেকে শহরের বাইরে দিয়ে গাবতলী উপজেলা পর্যন্ত যাবে। এর ফলে ১৫ কিলোমিটার বাড়তি রেলপথ নির্মাণ করতে হতো।

পর্যবেক্ষক মহলের প্রশ্ন, নতুন রেলপথ নির্মাণ বা পুরোনো রেথপথের সংস্কার বা বিদ্যমান কোনো রেলপথের ডাইভার্সন-ইত্যাদি বিষয় তো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নয়। এগুলো রেলওয়ে মন্ত্রণালয় বা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন। সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রী, তাও আবার স্থানীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী, কিভাবে নাক গলাতে পারেন? খবরে বলা হয়েছে যে, প্রতিমন্ত্রী নাকি রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি সরাসরি অন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন কিভাবে? তার মাথার ওপরে তো আরেকজন পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন। তিনি হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের নিকট অন্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বিশেষ অনুরোধ গেলে সেটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর মাধ্যমেই যাওয়ার কথা। খবর নিয়ে জানা গেছে, এব্যাপারে এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল কিছুই জানতেন না। এভাবে ঘোড়া ডিঙিয়ে এ প্রতিমন্ত্রী ঘাস খেতে চান কেনো?

আরো একটি খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যেটি আমাদের নজরে এসেছে। ঐ খবরে বলা হয়েছে যে, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরের ৫৩ বছরের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ আবেদন করা হয়। এ অ্যাডহক কমিটির প্রধান শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান।

৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় করার জন্য একটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

এর আগে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় ৩টি নতুন ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন এই প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। নতুন ৩টি ইউনিয়ন হলো, তার একপুত্র দিগন্তের নামে ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’, আরেক পুত্র সীমান্তের নামে, ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’ এবং তার নিজের বাসভবন মীর বাড়ির নাম দিয়ে, ‘মীর বাড়ি ইউনিয়ন’। এই ৩টি ইউনিয়ন শুধু প্রতিষ্ঠা নয়, এব্যাপারে রীতিমতো সরকারি গেজেটও প্রকাশিত হয়েছিলো।

এসব খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে শুধু ঢাকায় নয়, খোদ বগুড়া এবং শিবগঞ্জে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিষয়টি অনেকেরই নজর এড়িয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু জাতীয় সংসদে জামায়াতের বিশিষ্ট সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিষয়টি উত্থাপন করেন। এব্যাপারে প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা চাওয়া হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, গণশুনানি করে এসব ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা ও নাম দেওয়া হয়েছিলো। তবে তার ভাষায় ইংরেজিতে ‘মিরাকেলি’ ঐ সব নাম তার পুত্রের সাথে মিলে গিয়েছিলো। তার এ উত্তর সরকারী বা বিরোধীদল কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। একটি অনলাইন পত্রিকায় বলা হয়েছে যে, বিরোধী দল পুনরায় ফ্লোর চাইলে ফ্লোর দেওয়া হয়নি। তখন নাকি একজন সদস্য চিৎকার করে মাইক ছাড়াই বলেন যে, ইংরেজিত ‘মিরাকেলি’ বলে কোনো শব্দ নেই। ঐ শব্দটি হবে ‘মিরাকুলাসলি’ (Miraculously).

বিষয়টিতে এত সোরগোল হয় যে অবশেষে এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেলিফোনে বগুড়ার জেলা প্রশাসককে সীমান্ত, দিগন্ত ও মীর বাড়ি নামগুলো নতুন ইউনিয়ন থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন। বগুড়ার একাধিক সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে, গণশুনানি করে ঐ ৩টি ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্যি নয়। ঐসব সাংবাদিক শিবগঞ্জে সরে জমিনে তদন্ত করে দেখতে পেয়েছেন যে, শিবগঞ্জে ঐ ধরনের কোনোরূপ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশের পর এখন এই সব ইউনিয়নের নাম করনের গণশুনানি শুরু হয়েছে।

বিষয়টি বগুড়া জেলার একটি উপজেলা শিবগঞ্জ বা আরেকটি উপজেলা মোকামতলার হলেও সমালোচনাটি জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলো। এ বিষয় নিয়ে ইংরেজি ডেইলি স্টার, বাংলা দৈনিক যুগান্তর, বাংলা দৈনিক ইনকিলাব, বাংলা দৈনিক সমকাল প্রভৃতি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় লীড নিউজ বা প্রধান সংবাদ অথবা দ্বিতীয় প্রধান সংবাদ হিসাবে ছাপা হয়েছিলো।

১৯ জুন ডেইলি স্টার বলেছে যে, তাদের প্রতিনিধিদের কাছে সরকারি দলের উপরোক্ত ৩ জন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ছাড়াও ১৩ জন এমপি এবং স্ট্যান্ডিং বা স্থায়ী কমিটির ৬ জন সদস্য বলেছেন যে, সরকারের সমালোচনার একটি ইস্যু শাহে আলম বিরোধী দলের হাতে তুলে দিয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয় যে, ৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, ২ জন প্রতিমন্ত্রী, ১৩ জন এমপি এবং স্থায়ী কমিটির ৬ জন সদস্য- বিএনপির মোট ২৪ জন শীর্ষ নেতা বলেছেন যে, তারা তাদের নাম প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ প্রতিমন্ত্রীর had “close ties with the prime minister ”, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রিপোর্টের এক স্থানে বলা হয়েছে, “Perhaps someone is backing him, and that is why he is carrying out such controversial activities. We also cannot say much because we are not in that position,” the lawmaker added.” বাংলা অনুবাদ- সম্ভবত তাকে কেউ পেছন থেকে সমর্থন করছে। সেজন্যই তিনি এসব বিতর্কিত কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা এব্যাপারে বেশি কিছু বলতে পারি না। কারণ আমরা সেই অবস্থানে নাই।”

পরদিন ২০ জুন দৈনিক যুগান্তরে এ সম্পর্কে অনেক বড় একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আমরা বিস্তারিত রিপোর্টে যাচ্ছি না। শুধু রিপোর্টের ইনসেট তুলে দিচ্ছি।

(১) নানা আলোচনা ও গুঞ্জন।

(২) ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে বলেছি: প্রতিমন্ত্রী।

(৩) প্রধানমন্ত্রীর বিনয়ী ও জনবান্ধব নীতির সঙ্গে এসব ঘটনা সংগতিপূর্ণ নয়: ড. বদিউল আলম মজুমদার।

২১ জুন দৈনিক ইনকিলাব প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান সংবাদ হিসাবে যে রিপোর্টটি ছেপেছে তার শিরোনাম হলো, “ভারত ‘রামরাজ্য’, প্রতিমন্ত্রী ‘নামরাজ্য’, কায়েম করছে।” অতঃপর প্রধান সংবাদের মূল শিরোনাম দিয়েছে নিম্নরূপ- ‘শাহে আলমে তোলপাড়’। এই রিপোর্টের ইনসেট নিম্নরূপ-

(১) প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর দুই পুত্রের নামের ‘ইউনিয়ন পরিষদ নামকরণ’ পরিবর্তন হচ্ছে।

(২) পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক ও দৃষ্টিকটু: ড. বদিউল আলম মজুমদার।

(৩) তারেক রহমানের বন্ধুভাগ্য খুব খারাপ, আগে ছিলো মামুন এখন শাহে আলম: আবদুন নূর তুষার।

পর্যবেক্ষক মহলের মন্তব্য, নামকরণ থেকে বিরত রেখেও প্রতিমন্ত্রীকে থামানো যাচ্ছে না। তিনি শিবগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম নিজের নামে করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এখন আবার বগুড়া-সিরাজগঞ্জ প্রস্তাবিত রেল লাইনটি পরিবর্তন করে ভিন্ন পথে ডাইভার্ট করতে চেয়েছেন। এ সম্পর্কে রেল বিভাগকে চিঠি পর্যন্ত দিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের আওতা বহির্ভূত ও গর্হিত কাজ নাকচ করার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী একটি কাজ করবেন আর প্রধানমন্ত্রী তা নাকচ করবেন-এটিই কি এসব সমস্যার সমাধান? গ্রেট ব্রিটেনে ৭ বছরে ৫টি মন্ত্রিসভা বদল হয়েছে। ভারতে একটি রেল দুর্ঘটনা হয়েছিলো। এজন্য রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নিজেই পদত্যাগ করেছিলেন। শাহে আলম এমন তোঘলকি কারবার করে পার পেয়ে যাচ্ছেন কেনো?

Email:[email protected]