জাফর আহমাদ

ইহসানের প্রতিফল ইহসান ছাড়া আর কি হতে পারে? (সুরা আর রহমান : ৬০) ইহসানের সঠিক বঙ্গানুবাদ ‘সদাচার’ অর্থাৎ সদাচারের প্রতিফল সদাচার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। যে সব মানুষ আল্লাহ তা’আলার জন্য সারা জীবন পৃথিবীতে নিজেদের প্রবৃত্তির ওপর বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছিল, হারাম থেকে আত্মরক্ষা করে হালালের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে, ফরযকে ফরয মনে করে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে, ন্যায় ও সত্যকে ন্যায় ও সত্য মনে করে হকদারদের হক সমূহ আদায় করেছে এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে ন্যায় ও কল্যাণকে সমর্থন করেছে। আল্লাহ তাদের এসব ত্যাগ ও কুরবানিরকে ধ্বংস ও ব্যর্থ করে দেবেন এবং কখনো এর কোন প্রতিদান তাদের দেবেন না তা কি করে সম্ভব।

ইহসান আরবী শব্দ। ‘হুসন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘সুন্দর ব্যবহার। ভালভাবে কোন কাজ সম্পাদন করা, কারো কষ্ট লাঘব করা ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় ‘ইহসান হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উত্তমরূপে ইবাদাত করা, এবং তার সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা। এ প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ তা’আলার প্রতি এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি যাবতীয় কর্তব্য সুন্দর ও উত্তমরূপে সম্পাদন করার নামই ইহসান।

ইহসানের একটি সুন্দর উদাহরণ হচ্ছে, দু’জন কর্মচারীকে এক গ্লাস পানির জন্য আদেশ করা হলো। তাদের একজন একটি গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলো। আর অন্যজন একই আদেশ পাওয়ার পর একটি গ্লাস ভালো করে ধুয়ে স্বচ্ছ গ্লাসে পানি ভর্তি করে, গ øাসের নীচে একটি পাত্র ও গ্লাসটির ওপরে একটি ঢাকনা দিয়ে পরিবেশন করে। প্রথম জনের আদেশট্ িপালন হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয় জনের আদেশটিও পালন হয়েছে। কিন্তু প্রথম জনের কর্তব্য পালিত হয়েছে আর দ্বিতীয় জনের কর্তব্যের সাথে ইহসান যোগ হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় জনের কাজটি সুন্দর ও সুচারুরূপে পালিত হয়েছে। এই প্রথমজন মুসলিম বা অনুগত। আর দ্বিতীয়জন মুসলিম হওয়ার সাথে সাথে তিনি মুহসীন। ইহসান শব্দটি আরবী হুসনুন শব্দ থেকে নির্গত। অর্থ হলো, সুন্দর। যারা কোন কাজ সুন্দরভাবে ও সুচারুরূপে করে তাদেরকে ইসলামের পরিভাষায় মুহসিন বলা হয়। এর একটি সামাজিক উদাহরণ হলো, বাপের দুই সন্তান। একজন লেখাপড়া করেনি। গ্রামের বাড়িতে কৃষি কাজ করে জীবন নির্বাহ করে থাকে। দ্বিতীয়জন লেখাপড়া করে বড় চাকরি করে এবং শহরে বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে। কিন্তু বাবার সম্পত্তিতে অধিকারের দিক থেকে উভয়েই সমান। ছোট ভাই মনে করলো যে, আমি লেখাপড়া করে বড় চাকরি করছি। শহরে আমার বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে। বড় ভাই গ্রামে কঠিন জীবন যাপন করেন। সুতরাং বাবার সম্পত্তিতে তার অধিকারটুকু বড় ভাইয়ের জন্য ছেড়ে দেন। এটিকে সামাজিক ইহসান বলা হয়। ইবাদাতের ক্ষেত্রে ইহসান হলো, এমনভাবে ইবাদাত করা যাতে মনে হয় আমরা আল্লাহকে দেখছি, যদি আল্লাহ দেখতে না পাই তাহলে মনে করতে হবে আল্লাহ আমাদের দেখছেন। রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন,“তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছো, আর তুমি আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি তোমাকে দেখছেন-(মুসলিম)। পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অতিথি, দুস্থ ইয়াতীমের প্রতি ইহসান তথা সদাচরণ করার জন্য কুরআন মজিদে আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ এবং পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন এতিম মিসকিন আত্মীয় অনাত্মীয় সবার প্রতি ইহসান করো—- (সুরা নিসা : ৩৬)

একজন ইসলামী বিশেষজ্ঞ বলেছেন,‘ ইহসান মানে হচ্ছে, কাজ ভালোভাবে ও সুচারূƒপে সম্পন্ন করা। কাজ করার বিভিন্ন ধরণ আছে। তার একটা ধরণ হচ্ছে যে কাজটা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, সেটি কেবল নিয়ম মাফিক সম্পন্ন করা। দ্ধিতীয় ধরণ হচ্ছে, তাকে সূচারূƒপে সম্পন্ন করা এবং নিজের সমস্ত যোগ্যতা ও উপায় উপকরণ তার পিছনে নিয়োজিত করে সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে তাকে সূসম্পন্ন করার চেষ্টা করা। প্রথম ধরণটি নিছক আনুগত্যের পর্যায়ভুক্ত। এ জন্য তাকওয়া ও ভীতি যথেষ্ট। আর দ্ধিতীয় ধরণটি হচ্ছে ইহসান। এ জন্য ভালবাসা প্রেম ও গভীর মনসংযোগ প্রয়োজন হয়।

ইহসানকারী সাধারণত উন্নত চরিত্র, চরিত্র মাধুর্য, মহানুভবতা, সহনশীলতা, ব্যক্তি স্বার্থ বা আত্মত্যাগের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন। ফলে তার চিন্তাধারায় পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আচরণে মাধুর্যতা, ব্যবহারে নম্রতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, ওয়াদা ও অংগীকারে দৃঢ়তা, সামাজিক জীবন যাপনে সদাচার, কথা-বার্তায় চিন্তার ছাপ, চেহেরায় পবিত্রতার ভাব ফুটে উঠে। মোট কথা তাঁর সামগ্রীক জীবনে বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সুচিত হয়। যে জীবনধারার কোথাও কোন অন্ধকার ও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয় না।

মুহসিনের ব্যক্তির ব্যক্তিগত পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি কাজ ও কথায় বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ মু’মিন বা মুসলিম এবং একজন মুহসিনের পার্থক্য হলো এই যে, একজন মু’মিন ও মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন করেন, কোথাও দুর্বলতা নেই এবং খুলুছিয়াত বা আন্তরিকতারও অভাব নেই। কিন্তু প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারূত্া বলতে একটি কথা আছে। মুহসিন ব্যক্তি মু’মিন ও মুসলিমের ন্যায় জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর মর্জি মোতাবেক পালন তো করবেনই সেই সাথে তাঁর প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য ও সুচারুতা থাকবে। অর্থাৎ প্রতিটি মহুসিন মু’মিন কিন্তু প্রতিটি মু’মিন মুহসিন নয়। মুহসিন তিরস্কার, ব্যঙ্গোক্তি, অবজ্ঞা, দাম্ভিকতা, গর্ব-অহংকার, কটূক্তি, দম্ভোক্তি, কুৎসা রটনা, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে না। সে কখনো দুরাচার, দুর্বৃত্ত, পাপিষ্ঠ, কদাচার, দুর্বচন, দূর্বাক, দুর্মূখ, দুরভিসন্ধি, দৃর্বৃত্তায়ন, দুর্র্বির্নীত, দুর্বুদ্ধি, দুর্ব্যবহার, দুশ্চরিত্র. দুষ্কর্ম ও দুষ্কর্ম ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে না।

মানব জীবনে ইহসানের গুরুত্ব এতবেশী যে, মহান আল্লাহ ইহসানকারী বা মুহসিনকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তার পূর্বে যা কিছু পনাহার করেছিল সে জন্য তাদেরকে কোন জবাবদিহি করতে হবে না, তবে এ জন্য শর্ত হচ্ছে তাদেরকে অবশ্যি ভবিষ্যতে যেসব জিনিস হারাম করা হয়েছে সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে, ঈমানের ওপর অবিচল থাকতে হবে এবং ভাল কাজ করতে হবে তারপর যে যে জিনিস থেকে বিরত রাখা হয় তা থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে এবং আল্লাহর যেসব হুকুম নাযিল হয় সেগুলো মেনে চলতে হবে। অতপর আল্লাহভীতি সহকারে ইহসান করতে হবে। ইহসানকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন।” (সুরা মায়েদা:৯৩) মুসলিম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইহসানের ছোঁয়া রয়েছে। কিন্তু আমরা যেনতেনভাবে ইসলামী জীবন যাপন করায় ইহসানের গুরুত্ব ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সৎকর্মশীল, সৎ ব্যবহার ও অন্যের উপকার ও মাফ বা ক্ষমা করাকেও ইহসান বলা হয়। এগুলো ইহসানকারীর বৈশিষ্ট। এই দৃষ্টিতে সুরা মায়েদার ১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে,“আল্লাহ ইহসানকারীকে ভালোবাসেন।

অনুগ্রহ করা মুহসিনদের বৈশিষ্ট্য। অল্লাহ তা’আলা বলেন,“আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। অনুগ্রহের পথ অবলম্বন করো, কেননা আল্লাহ মুহসিনদেরকে(অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেকে) ভালোবাসেন।” (সুরা বাকারা : ১৯৫) “শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কারও দিয়েছেন এবং তার চেয়ে ভালো অখেরাতের পুরস্কারও দান করেছেন। এ ধরনের মুহসিনদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন।” (সুরা আলে ইমরান : ১৪৮) “যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে অন্যের দোষ-ত্রুটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের মুহসীনদেরকে আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান : ১৩৪)

এ ধরনের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিদের পুরস্কার ইহসান ছাড়া আর কি হতে পারে। দুনিয়ার জীবনে তারা ছিল মুহসীন আর আখিরাতে তাদের পুরস্কারের জন্য মহান আল্লাহ হবেন মুহসীন। অর্থাৎ ইহসানের বদলা ইহসান ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। দুনিয়ার জীবনে এরা মানুষের ভালোবাসার পাত্র। মানুষ তাদেরকে ভালোবাসে, সম্মান ও সমীহ করে। আর আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র বলে আখিরাতেও তাদের প্রতি ইহসান করা হবে।

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।